বরইতলী ট্রেইল: পাহাড়ি ঝিরিপথ আর লুক্কায়িত ঝর্ণার মায়াবী রাজ্য
বাংলাদেশের পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের বরইতলী-মংজয় পাড়া এলাকায় সন্ধান মিলেছে এক নতুন ও রোমাঞ্চকর ট্রেইলের। স্থানীয়দের কাছে এটি বরইতলী ফাত্রাঝিরি ঝর্ণা বা বরইতলী ট্রেইল নামে পরিচিত। ফৈরাঙধং, তুলাতুলী ও জামতলী পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উৎপন্ন হওয়া এই ট্রেইলটি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের মনে দারুণ শিহরণ জাগাচ্ছে। আঁকাবাঁকা ঝিরিপথ, পাহাড়ি ঝরনাধারা এবং সবুজ প্রকৃতির হাতছানি—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে ট্রেকারদের নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
বরইতলী ট্রেইলের দর্শনীয় দিক
এই ট্রেইলের মূল আকর্ষণ হলো এর লুক্কায়িত ঝর্ণাগুলো। এখানে প্রধানত তিনটি আকর্ষণীয় ঝর্ণার দেখা মেলে:
- নিঝুম ঝর্ণা: ট্রেইলের শুরুতেই ছোট ও সুন্দর দুটি পৃথক ঝর্ণার দেখা মিলবে, যা পর্যটকদের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
- ত্রিমুখী বা মুরং ঝর্ণা: ট্রেইলের শেষ প্রান্তে রয়েছে সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় ঝর্ণাটি। এটি ত্রিমুখী ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত, কারণ এর তিন দিক থেকে পানি নেমে আসে এবং অন্য একটি দিক দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: ঝিরিপথে হাঁটার সময় দুই পাশের জুম চাষ, পেয়ারা, আম, জাম্বুরা ও লেবু বাগান আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে। এছাড়া পাললিক শিলা এবং পাহাড়ি উদ্ভিদের সমাহার পথটিকে করেছে আরও আকর্ষণীয়।
ভ্রমণের সেরা সময়
বর্ষাকালে ঝর্ণাগুলো তাদের পূর্ণ যৌবন ফিরে পায় এবং পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। তাই বর্ষাকালই বরইতলী ট্রেইল ভ্রমণের সেরা সময়। তবে বর্ষায় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায় এবং হুট করে ফ্লাশ ফ্লাড বা পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থাকে। তাই আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা উচিত।
যাওয়ার উপায় ও যাতায়াত খরচ
কক্সবাজারের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় এই ট্রেইল ভ্রমণ করা বেশ সহজ। নিচে বিস্তারিত রুট দেওয়া হলো:
- প্রথম ধাপ: প্রথমে কক্সবাজার বাস টার্মিনাল থেকে উখিয়াগামী মিনিবাসে চড়ে ‘মরিচ্যা বাজার’ নেমে যান। বাস ভাড়া ৩০ টাকা (সিএনজিতে গেলে ৬০ টাকা)।
- দ্বিতীয় ধাপ: মরিচ্যা বাজার থেকে ইজিবাইক বা সিএনজি রিজার্ভ করে চলে যান বরইতলী-মংজয় পাড়ার লেবু বাগান ভাবনা কেন্দ্রের সামনে। ইজিবাইক ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা এবং সিএনজি ১৫০-২৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
- তৃতীয় ধাপ: ভাবনা কেন্দ্রের পাশ থেকে কাঁচা সড়ক ধরে লেবু বাগান পেরিয়ে নামতে হবে ঝিরিপথে। এরপর স্রোতের বিপরীতে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রোকিং করে পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত ঝর্ণায়।
থাকা-খাওয়ার তথ্য
বরইতলী ট্রেইল এলাকায় রাত্রিযাপনের জন্য কোনো আবাসিক হোটেল বা কটেজ নেই। তাই দিনের দিন ভ্রমণ শেষ করতে হবে। থাকার জন্য কক্সবাজার কিংবা উখিয়ার হোটেলগুলোতে উঠতে পারেন। অন্যদিকে, খাওয়ার জন্য মরিচ্যা বাজার থেকেই প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পানি ও ফার্স্ট এইড কিনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পাহাড়ি পথে খাওয়ার সুব্যবস্থা নেই।
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও টিপস
- ঝিরিপথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপের ট্র্যাকিং স্যান্ডেল বা জুতো ব্যবহার করুন।
- পথ চেনার সুবিধার্থে স্থানীয় একজন অভিজ্ঞ গাইড সাথে নেওয়া বাধ্যতামূলক।
- জরুরি প্রয়োজনে সাথে রাখুন স্যালাইন, ফার্স্ট এইড ব্যান্ডেজ, পানি ও শুকনো খাবার।
- পরিবেশ রক্ষায় চিপসের প্যাকেট বা প্লাস্টিক বোতলত্র এখানে-সেখানে ফেলবেন না।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
বরইতলী ট্রেইলে কতটি ঝর্ণা রয়েছে?
এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০টিরও বেশি ঝর্ণার উৎস রয়েছে, যার মধ্যে ৩টি প্রধান ঝর্ণা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
ঝিরিপথে হাঁটতে কত সময় লাগে?
লেবু বাগান পার হয়ে ঝিরিপথ ধরে মূল ঝর্ণায় পৌঁছাতে সাধারণত ২ ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
গাইড নেওয়া কি জরুরি?
হ্যাঁ, যেহেতু এটি একটি নতুন পাহাড়ি ট্রেইল এবং ঝিরিপথ পরিবর্তনশীল, তাই পথ হারানোর ঝুঁকি এড়াতে স্থানীয় গাইড নেওয়া খুবই জরুরি।


