প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি মেঘালয় বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেঘে ঢাকা পাহাড় আর জলপ্রপাতের সুর। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মেঘালয়ের বুকেই লুকিয়ে রয়েছে এক রূপকথার পৃথিবী? বলছি নংরিয়াত (Nongriat) গ্রামের কথা। এটি এমন এক গ্রাম, যেখানে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম হলো নিজের দুই পা। পাহাড়ি খাদের গভীরে অবস্থিত এই অফবিট লোকেশনটি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের কাছে এক পরম প্রাপ্তি। চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক মেঘালয়ের এই রহস্যময় জনপদ সম্পর্কে বিস্তারিত।
নংরিয়াতের পরিচিতি
মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির কাছাকাছি অবস্থিত নংরিয়াত একটি সাজানো-গোছানো পাহাড়ি গ্রাম। এখানকার মূল আকর্ষণ প্রকৃতির জীবন্ত শিল্পকর্ম—ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ (Double Decker Root Bridge)। শত শত বছর ধরে গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি এই সেতুগুলো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক বিস্ময়। এছাড়া এখানে রয়েছে সিঙ্গেল রুট ব্রিজ, পাহাড়ি নদীর স্বচ্ছ জল, সাসপেনশন ব্রিজ এবং চোখ জুড়ানো রেইনবো ফলস। বছরের একেক সময়ে এই জায়গার রূপ একেক রকম ধরা দেয়। শীতকালে এখানকার ঝরনার পানি কাঁচের মতো স্বচ্ছ ও নীল দেখায়, যা যে কাউকে মোহিত করবে। অন্যদিকে বর্ষায় এর রূপ হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর ও শক্তিশালী।
নংরিয়াত যাওয়ার উপায় ও ট্রেকিং গাইড
ঢাকা বা গুয়াহাটি হয়ে মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে করে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে পৌঁছানো যায় তৃর্না ভিলেজ (Tyrna Village)-এ। মূল ট্রেকিং শুরু হয় এই তৃর্না থেকেই।
- সিঁড়ি পথ: তৃর্না থেকে নংরিয়াত যাওয়ার জন্য প্রায় ৩,৭০০টির বেশি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়। ফেরার সময় এই সিঁড়িগুলোই আবার বেয়ে উঠতে হবে। তাই একটু শারীরিক প্রস্তুতি রাখা ভালো।
- পথের অভিজ্ঞতা: পুরো পথটি পাকা সিমেন্টের তৈরি এবং কিছু জায়গায় রেলিং দেওয়া আছে। পথিমধ্যে আপনার দেখা মিলবে দুটি দৃষ্টিনন্দন সাসপেনশন ব্রিজ ও কিছু লিভিং রুট ব্রিজের।
- প্রয়োজনীয় টিপস: তৃর্না গ্রাম থেকে একটি বাঁশের লাঠি কিনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি একদিনে ফিরে আসার পরিকল্পনা থাকে, তবে ভারী ব্যাগ তৃর্নাতেই কোনো দোকানে রেখে যেতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, বিকেল ৫টার পর তৃর্না গ্রাম থেকে নংরিয়াতের উদ্দেশ্যে পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ।
দর্শনীয় আকর্ষণসমূহ
নংরিয়াতের আশপাশে দেখার মতো বেশ কিছু অসাধারণ স্থান রয়েছে:
- ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ: নংরিয়াত গ্রামের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিখ্যাত গাছের শিকড়ের সেতু।
- ন্যাচারাল সুইমিং পুল: গ্রামের পরিবেশের মাঝেই রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সুইমিং পুল, যেখানে ক্লান্তিকর ট্রেকিংয়ের পর শরীর জুড়িয়ে নিতে পারেন।
- রেইনবো ফলস (Wei phngam Falls): নংরিয়াত থেকে আরও প্রায় ১ ঘণ্টা হেঁটে এই ঝরনায় পৌঁছাতে হয়। এর বিশেষত্ব হলো, দুপুরে সূর্যের আলো যখন পানির ওপর পড়ে, তখন চারপাশের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন না থাকলেও ঝরনার তলায় চমৎকার রংধনু দেখা যায়। শীতকালে এর পানি নীলাভ রূপ ধারণ করে।
থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা
নংরিয়াত গ্রামে রাত কাটানোর জন্য বেশ কিছু চমৎকার হোমস্টে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো শিরিন হোমস্টে (Serene Homestay)। এখানে ডরমেটরিতে প্রতি ব্যক্তির জন্য মাত্র ৩০০ রুপি খরচ হতে পারে। স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার জন্য এখানে এক রাত কাটানো দারুণ অভিজ্ঞতা হবে। খাওয়ার জন্য হোমস্টেতেই লোকাল খাবারের ব্যবস্থা পেয়ে যাবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. নংরিয়াত ট্রেকিং কি খুব কঠিন?
ট্রেকিংয়ে প্রায় ৩,৭০০+ সিঁড়ি ভাঙতে হয় বিধায় এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা ক্লান্তিকর। তবে রাস্তা সিমেন্টেড হওয়ায় ট্রেইলের পথ চেনা সহজ। নিয়ম মেনে ধীরে হাঁটলে যে কেউ এটি সম্পন্ন করতে পারবেন।
২. নংরিয়াত যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (শীতকাল) হলো নংরিয়াত ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় আবহাওয়া অনুকূল থাকে এবং ঝরনার পানি নীল ও স্বচ্ছ দেখা যায়।
৩. রেইনবো ফলস যাওয়ার পথ কেমন?
নংরিয়াত গ্রাম থেকে রেইনবো ফলস যাওয়ার পথটি বেশ দুর্গম। এখানে কোনো পাকা সিঁড়ি নেই, বরং পাথুরে ও খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠতে হয়।


