দামতুয়া ঝর্ণা পরিচিতি
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নাম দামতুয়া ঝর্ণা। এটি স্থানীয়দের কাছে ‘তুক অ’ বা ‘লামোনই’ ঝর্ণা নাম থেকেও পরিচিত। আলীকদম উপজেলার মুরং পাড়ার এই ঝর্ণার নামকরণের পেছনে রয়েছে চমৎকার ইতিহাস। স্থানীয় মুরং ভাষায় ‘তুক’ অর্থ ব্যাঙ এবং ‘অ’ অর্থ ঝিরি। ঝর্ণাটি যে খাড়া দেয়ালে অবস্থিত, তার ওপর দিয়ে সহজে কোনো ব্যাঙ বা জলজ প্রাণী উঠতে পারে না বলেই এর নাম হয়েছে দামতুয়া। তাছাড়া, রাতের চাঁদের আলোয় ঝর্ণার রূপ অন্যমাত্রা পায় বলে মুরং ভাষায় একে ‘লামোনই’ (চাঁদের আলো) বলেও ডাকা হয়। দুই দিক থেকে নেমে আসা পানির ধারা আর চারপাশের সবুজ পাহাড় প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে গভীর দাগ কাটে।
যাওয়ার উপায় ও খরচ
ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে দামতুয়া ঝর্ণা যেতে হলে প্রথমে আপনাকে বান্দরবানের আলীকদম পৌঁছাতে হবে।
ঢাকা থেকে আলীকদম
ঢাকা থেকে সরাসরি আলীকদমের বাস ছাড়ে (যেমন- হানিফ এন্টারপ্রাইজ)। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৮৫০ টাকার কাছাকাছি। এছাড়া ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে চকোরিয়া বাস টার্মিনালেও নামা যায়। সেখান থেকে লোকাল বাসে মাত্র ৭০ টাকায় আলীকদম পৌঁছানো সম্ভব।
আলীকদম থেকে দামতুয়া ঝর্ণা
আলীকদম বাসস্ট্যান্ড বা পানবাজার থেকে মোটরসাইকেল বা জিপ (চাঁদের গাড়ি) ভাড়া করতে হবে। মোটরসাইকেলে জনপ্রতি ২৫০-৩০০ টাকায় ১৭ কিলোমিটার দূরে ‘আদুপাড়া’ গ্রামে পৌঁছানো যায়। যাত্রাপথে ১০ কিমি পয়েন্টের আর্মি ক্যাম্পে এনআইডি ও ফোন নম্বর দিয়ে নাম এন্ট্রি করতে হবে। মনে রাখবেন, বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পের নিয়মানুযায়ী রিপোর্ট করতে হয়। আদুপাড়া থেকে স্থানীয় গাইড নিয়ে শুরু হয় রোমাঞ্চকর ট্রেকিং। আসা-যাওয়ায় প্রায় ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। গাইডের মজুরি এবং অন্যান্য খরচ আলোচনা করে ঠিক করে নিতে হবে।
দর্শনীয় দিক
দামতুয়া ঝর্ণার চারপাশের পরিবেশ এতটাই নিখাদ ও নির্জন যে শহুরে ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। ট্রেকিংয়ের সময় পাহাড়ি ঝিরিপথ, আদিবাসীদের জীবনযাত্রা এবং সবুজ বনের রূপ মুগ্ধ করবে। ঝর্ণার মূল পয়েন্টে পৌঁছানোর পর জোড়া ধারার পতন এবং এর পাথুরে গঠন যেকোনো পর্যটককে বিমোহিত করবে। বর্ষাকালে এর জলের স্রোত যেমন বাড়ে, তেমনি এর ভয়ংকর সুন্দর রূপও প্রকাশ পায়।
থাকা-খাওয়ার তথ্য
দামতুয়া ঝর্ণার কাছাকাছি সরাসরি কোনো উন্নত মানের হোটেল বা রিসোর্ট নেই। তাই থাকার জন্য আপনাকে আলীকদম সদরে ফিরে আসতে হবে। আলীকদমে সাধারণ মানের কিছু আবাসিক হোটেল পেয়ে যাবেন, যেখানে কম খরচে রাত কাটানো সম্ভব। খাবারের জন্য আলীকদম বাজারে স্থানীয় রেস্তোরাঁ রয়েছে। তবে ট্রেকিংয়ের দিন দুপুরবেলা খাওয়ার জন্য আদুপাড়া বা আলীকদম বাজার থেকেই শুকনো খাবার, পানি ও এনার্জি ড্রিংকস সাথে নিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. দামতুয়া ঝর্ণা যাওয়ার উপযুক্ত সময় কোনটি?
বর্ষাকাল এবং বর্ষার পরবর্তী সময়টুকু (জুলাই থেকে অক্টোবর) দামতুয়া ঝর্ণা ভ্রমণের সেরা সময়। এ সময় ঝর্ণায় প্রচুর পানি থাকে এবং চারপাশ থাকে সবুজ। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, তাই সাবধানে চলতে হবে।
২. দামতুয়া ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য কি গাইডের প্রয়োজন আছে?
হ্যাঁ, রাস্তা দুর্গম এবং অপরিচিত হওয়ায় আদুপাড়া থেকে একজন অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক এবং নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি।
৩. ট্রেকিং করতে কেমন সময় লাগে?
আদুপাড়া থেকে ঝর্ণায় যাওয়া এবং আবার ফিরে আসা পর্যন্ত সবমিলিয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টার মতো ট্রেকিং করতে হয়। তাই পর্যাপ্ত শারীরিক প্রস্তুতি ও মানসিক প্রস্তুতি রাখা দরকার।


