• Home
  • Trip
  • বান্দরবানের রহস্যঘেরা জিংসিয়াম সাইতার: ইতিহাস, রুট ও ভ্রমণ গাইড

বান্দরবানের রহস্যঘেরা জিংসিয়াম সাইতার: ইতিহাস, রুট ও ভ্রমণ গাইড

পরিচিতি

বান্দরবানের পাহাড়ি অরণ্যে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার যেন শেষ হওয়ার নয়। রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি পথে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নাম না জানা ঝর্ণা। এর মধ্যে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় এবং কিছুটা রহস্যময় ঝর্ণা হলো জিংসিয়াম সাইতার। বম ভাষায় ‘সাইতার’ শব্দের অর্থ ঝর্ণা। এই ঝর্ণার নামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক ইতিহাস, যা ভ্রমণপিপাসুদের মনে শিহরণ জাগায়। রুমানা পাড়ার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা এই ঝর্ণার তিন ধাপে রয়েছে ভিন্ন রূপের সৌন্দর্য। রোমাঞ্চপ্রিয় ট্র্যাকারদের কাছে এটি একটি স্বপ্নীল গন্তব্য।

নামকরণের পেছনের করুণ ইতিহাস

জিংসিয়াম সাইতার নামকরণের ইতিহাসটি বেশ মর্মান্তিক। স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের ‘জিংসিয়াম’ নামের এক তরুণী তরুণীর নামানুসারে ঝর্ণাটির নামকরণ করা হয়েছে। জিংসিয়াম ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল স্বভাবের এক তরুণী, যিনি রুমানা পাড়াতেই বসবাস করতেন। একদিন তিনি জুমচাষের ক্ষেতে শাকসবজি আনতে যান। কথা ছিল দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরবেন, কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও তিনি ফেরেননি। পরবর্তীতে পাড়ার লোকজন উৎকণ্ঠিত হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর গভীর রাতে, প্রায় রাত দুইটার দিকে এই ঝর্ণার পাদদেশে তাঁর lifeless দেহ উদ্ধার করা হয়। সেই থেকেই বম পাড়ার মানুষ ও ভ্রমণকারীরা এই ঝর্ণাকে জিংসিয়াম সাইতার নামে ডাকতে শুরু করেন।

যাওয়ার উপায় ও খরচ

জিংসিয়াম সাইতার ভ্রমণ বেশ দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ট্রেকিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এই রুটে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিচে যাতায়াতের বিস্তারিত দেওয়া হলো:

  • ঢাকা থেকে বান্দরবান: ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে এস আলম, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন বা শ্যামলীর মতো বাসে বান্দরবান যেতে পারেন। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৬২০-৭০০ টাকার মধ্যে।
  • বান্দরবান থেকে রুমা বাজার: বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড থেকে চান্দের গাড়ি (জিপ) বা লোকাল বাসে রুমা বাজার যাওয়া যায়। জিপে প্রতি জন ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা।
  • রুমা বাজার থেকে বগালেক ও কেওক্রাডং: রুমা বাজার থেকে বগালেক এবং পরবর্তী পথ পাড়ি দিতে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে। রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত গাড়ি ভাড়া আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
  • ট্রেকিং রুট: বগালেক থেকে কেওক্রাডং, পাসিংপাড়া, সুংসং পাড়া হয়ে আপনাকে পৌঁছাতে হবে রুমানা পাড়ায়। বগালেক থেকে রুমানা পাড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ হাঁটতে হবে।

দর্শনীয় দিক ও রুট বিন্যাস

জিংসিয়াম সাইতারে মূলত তিনটি চমৎকার ধাপ রয়েছে। রুমানা পাড়া হলো একটি অত্যন্ত পরিপাটি ও সুন্দর বম পাড়া, যার আগের নাম ছিল ‘সানকুপ পাড়া’। পাড়া প্রধানকে ‘কারবারি’ বলা হয়। রুমানা পাড়ায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি গির্জাও রয়েছে। ঝর্ণা দেখার জন্য দুটি ভিন্ন রুট ব্যবহার করা যায়:

  • রুট ১ (রুমানা পাড়া হয়ে): এই দিক থেকে গেলে প্রথমে ঝর্ণার কুণ্ড, এরপর দ্বিতীয় ও প্রথম ধাপ দেখে আবার পাড়ায় ফিরে আসতে হয়।
  • রুট ২ (লুংথাউসিহ পাড়া হয়ে): এই রুট দিয়ে গেলে একে একে সবকটি ধাপ ঘুরে সরাসরি রুমানা পাড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।

থাকা-খাওয়ার তথ্য

পাহাড়ে উন্নত মানের কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। রাত্রিযাপনের জন্য ভরসা হলো স্থানীয় বম পাড়ার কটেজ বা হোমস্টে। রুমানা পাড়া কিংবা সুংসং পাড়ার স্থানীয় কারবারি বা পাড়াবাসীর সহায়তায় বাঁশ-কাঠের মাচাং ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা যায়। খাবারের জন্য পাড়ার মানুষের সাথেই কথা বলে দেশি মুরগি, পাহাড়ি চালের ভাত ও জুমের সবজির অর্ডার করতে পারেন। খরচ জনপ্রতি বেলা ৩০০-৫০০ টাকার মতো হতে পারে।

সতর্কতা ও টিপস

  • পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের সময় পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন এবং শুকনো খাবার সাথে রাখুন।
  • ভালো মানের ট্র্যাকিং জুতো ব্যবহার করুন, কারণ পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হতে পারে।
  • স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন এবং পাড়ার নিয়মকানুন মেনে চলুন।
  • ঝর্ণার পানিতে নামার সময় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করুন।

FAQ

১. জিংসিয়াম সাইতার কোথায় অবস্থিত?

জিংসিয়াম সাইতার ঝর্ণাটি বান্দরবানের রুমা উপজেলার রুমানা পাড়ার কাছাকাছি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত।

২. জিংসিয়াম সাইতার যাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় কোনটি?

বর্ষাকাল ও এর ঠিক পরের সময়টায় (জুলাই থেকে নভেম্বর) ঝর্ণায় ভরপুর পানি থাকে এবং এর প্রকৃত রূপ দেখা যায়। তবে ট্র্যাকিংয়ের সুবিধার জন্য অনেকেই শীতকালও বেছে নেন।

৩. রুমানা পাড়ায় কি থাকার ভালো ব্যবস্থা আছে?

রুমানা পাড়ায় কোনো আধুনিক হোটেল নেই, তবে স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের হোমস্টে বা কটেজে খুব সহজেই রাতে থাকার ব্যবস্থা করা যায়।

0
0
অর্ডার লিস্ট
কার্টে কিছু নেইআবার অর্ডার করুন