রোথাং পাস পরিচিতি: মেঘের দেশে এক অন্য পৃথিবী
হিমালয়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হিমাচল প্রদেশের মানালী এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যের নাম। আর এই সৌন্দর্যের মুকুটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ১৩,৫০০ ফুট বা প্রায় ৪,০০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত বিখ্যাত রোথাং পাস (Rohtang Pass)। কুলু এবং লাহুল উপত্যকাকে পৃথক করেছে এই ঐতিহাসিক গিরিপথ। একই সাথে এটি লেহ-লাদাখ যাওয়ার অন্যতম প্রধান এন্ট্রি পয়েন্ট হিসেবেও পরিচিত। যারা বরফ ভালোবাসেন এবং অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য রোথাং পাস ভ্রমণ জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে।
রোথাং পাস ভ্রমণের সেরা সময় ও মাসভিত্তিক আপডেট
সারাবছর বরফে ঢাকা থাকায় এই পাহাড়ি রাস্তাটি সবসময় খোলা থাকে না। সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বরফ সরিয়ে পর্যটকদের জন্য পথ খুলে দেওয়া হয় এবং তা নভেম্বর পর্যন্ত চালু থাকে। শীতের পুরো সময়টায় ভারী তুষারপাতের কারণে পথ বন্ধ থাকে। মাসভিত্তিক আবহাওয়া ও যাতায়াতের চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
- ফেব্রুয়ারি: মানালী শহরে তুষারপাত হয়, গাড়ি কেবল কোথি (Kothi) পর্যন্ত যেতে পারে।
- মার্চ: গুলাবা ভ্যালি (Gulaba Valley) পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি মেলে।
- এপ্রিল: মারহি (Marhi) পর্যন্ত রাস্তা পরিষ্কার করা হয়।
- মে থেকে নভেম্বর: অবশেষে মূল রোথাং পাসের দরজা পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়।
মানালী থেকে রোথাং পাস যাওয়ার উপায় ও খরচ
মানালী থেকে রোথাং পাসের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। লেহ-মানালী ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে এই পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে মনে রাখবেন, শিমলা-মানালী রুটে চলাচলকারী সাধারণ গাড়িগুলো রোথাং পাস যাওয়ার অনুমতি পায় না। এর জন্য মানালীর নির্দিষ্ট ট্যুরিস্ট ইউনিয়নের গাড়ি ভাড়া করতে হবে।
- গাড়ি পারমিট: পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক (প্রায় ১২০০-১৫০০) গাড়িকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। গুলাবা ভ্যালিতে এই পারমিট চেক করা হয়। চালকের পরিচয়পত্র দিয়ে প্রায় ৫০০ টাকা খরচে এই পারমিট সংগ্রহ করতে হয়।
- গাড়ি ভাড়া: গাড়ি ভাড়ার কোনো নির্দিষ্ট সরকারি রেট নেই, এটি সম্পূর্ণ দরদাম করে ঠিক করতে হয়। আপনার হোটেলের রিসেপশন বা মানালী মল রোড থেকে এই গাড়ি বুক করতে পারবেন।
- সতর্কতা: প্রতি মঙ্গলবার রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য রোথাং পাস সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ভ্রমণের দিন নির্ধারণের সময় বিষয়টি মাথায় রাখবেন।
রোথাং পাসের প্রধান আকর্ষণ ও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস
রোথাং পাসে পৌঁছানোর পর আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে চারপাশের আল্পাইন দৃশ্য দেখে। এখানকার প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
পাসটির চূড়ায় পৌঁছানোর পর চারপাশের বরফাবৃত পাহাড়ের দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। এছাড়া এখানে বরফের ওপর স্কিইং, স্নো বাইকিং এবং প্যারাগ্লাইডিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর স্পোর্টস উপভোগ করতে পারবেন। বরফ খেলার সময় ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা পেতে মাত্র ২৫০ টাকার বিনিময়ে পুরো শরীরের জন্য বিশেষ স্নো-স্যুট বা পোশাক ভাড়ায় পাওয়া যায়। ফেরার পথে পলচান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে ঘুরে আসতে পারেন অপরূপ সুন্দর সোলাং ভ্যালি (Solang Valley), যা প্যারাগ্লাইডিং এবং রোপওয়ে রাইডের জন্য বিখ্যাত।
খাওয়া-দাওয়া ও ভ্রমণের জরুরি টিপস
সকালে যতো দ্রুত সম্ভব মানালী থেকে রওনা দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ পিক সিজনে গাড়ির দীর্ঘ জ্যাম এড়াতে ভোরবেলা বের হওয়াই ভালো।
- যাত্রাপথে কোথি নামক স্থানে ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে পারেন। সাথে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার রাখুন।
- মারহি এলাকায় বর্তমানে কিছু ছোট চায়ের দোকান ও ম্যাগির স্টল পাওয়া যায়।
- রোথাং পাস মূলত সারাদিনের একটি ট্রিপ। সকাল সকাল রওনা দিয়ে বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে মানালীতে ফিরে এসে মল রোডে শপিং এবং সময় কাটাতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. রোথাং পাস যেতে কি কোনো আইডি প্রুফ লাগে?
পর্যটকদের আলাদা করে কোনো আইডি প্রুফ না লাগলেও, গাড়ির ড্রাইভারের পরিচয়পত্র দিয়ে নির্দিষ্ট পারমিট সংগ্রহ করতে হয়।
২. প্রতি সপ্তাহে কোন দিন রোথাং পাস বন্ধ থাকে?
প্রতি মঙ্গলবার রক্ষণাবেক্ষণের কারণে রোথাং পাস বন্ধ রাখা হয়।
৩. মানালী থেকে রোথাং পাসের দূরত্ব কত?
মানালী থেকে রোথাং পাসের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার এবং পৌঁছাতে সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে।
৪. বরফে খেলার পোশাক কোথায় পাওয়া যায়?
পাসটিতে যাওয়ার পথেই বা স্থানীয় শপে বরফে ভিজে না যাওয়ার জন্য মাত্র ২৫০ টাকায় ফুল বডি স্নো-স্যুট ভাড়ায় পাওয়া যায়।


