পরিচিতি
বাংলাদেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে মৌলভীবাজার জেলা এক অন্যরকম ভালোবাসার নাম। সবুজের সমারোহে ঘেরা এই অঞ্চলের বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত বিখ্যাত মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত কমবেশি সবারই চেনা। তবে এই জনপ্রিয় ঝর্ণার ঠিক পাশেই লুকিয়ে আছে আরেকটি অপরূপ ও তুলনামূলক কম পরিচিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—পরিকুণ্ড ঝর্ণা। মাধবকুণ্ডের ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে যারা একটু নির্জনতা ও প্রকৃতির খুব কাছাকাছি সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য পরিকুণ্ড এক দারুণ পছন্দ। প্রায় ১৫০ ফুট উঁচুতে খাড়া পাথরের দেয়াল বেয়ে পড়ার সময় পানির শোঁ শোঁ শব্দ এবং চারপাশের সবুজ পাতার মিতালি যে কাউকে বিমোহিত করবে। ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে গোসল করার আনন্দ বা পাথরে বসে এর নৈসর্গিক রূপ উপভোগ করার অনুভূতি ভ্রমণপিপাসুদের দীর্ঘসময় মনে থাকবে। ঝর্ণাটি ঘুরে দেখার আদর্শ সময় হলো বর্ষাকাল, কারণ এ সময় এর পানির প্রবাহ থাকে ভরপুর।
যাওয়ার উপায় ও খরচ
ঢাকা থেকে পরিকুণ্ড ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য ট্রেন, বাস ও আকাশপথ—তিনটি মাধ্যমই ব্যবহার করা যেতে পারে:
- ট্রেনে যাতায়াত: ঢাকা থেকে কমলাপুর বা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা বা উপবন এক্সপ্রেসে করে সরাসরি কুলাউড়া স্টেশনে নামতে হবে। ট্রেনের শ্রেণিভেদে ভাড়া ১২০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। কুলাউড়া থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি মাধবকুণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়, যার খরচ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
- বাসে যাতায়াত: শ্যামলী, হানিফ, এনা বা সোহাগ পরিবহনে মৌলভীবাজারের বড়লেখার ঠিক আগের স্টপেজ ‘কাঠাঁলতলী’ বাজারে নামতে হবে। নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৩০০-৩৫০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ৯০০ টাকার মতো। কাঠাঁলতলী থেকে সিএনজি বা রিকশায় জনপ্রতি ১৫-২০ টাকা ভাড়ায় কিংবা রিজার্ভ ১০০ টাকায় মাধবকুণ্ড পৌঁছানো সম্ভব।
- বিমানে যাতায়াত: ঢাকা থেকে বিমানে সিলেট পৌঁছে সেখান থেকে বাস বা লোকাল বাহনে মৌলভীবাজার আসা যায়।
মাধবকুণ্ডের প্রধান ফটক পার হয়ে হাতের বামে টিলার ওপর শিবমন্দির পেরিয়ে একটি নতুন পাকা সিঁড়ি দেখতে পাবেন। সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পাথুরে ছড়া ধরে ১০-১৫ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত পরিকুণ্ড ঝর্ণায়। পথিমধ্যে পানির ছড়ায় কেবল পা ভিজবে, তবে পাথরে শ্যাওলা থাকায় সাবধানে হাঁটা জরুরি।
দর্শনীয় দিক
পরিকুণ্ড ঝর্ণার চারপাশটা যেন কোনো শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। বিভিন্ন প্রজাতির বুনো গাছপালা আর ঘন সবুজ পাহাড় ঝর্ণাটিকে ঢেকে রেখেছে এক রহস্যময় আবরণে। বড় বড় পাথরের ওপর বসে ঝর্ণার ঠান্ডা জলের ঝাপ্টা গায়ে মাখা এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়। এর আশপাশের ট্রেইল ধরে হাঁটার সময় চারপাশের জীববৈচিত্র্য ও পাখির ডাক ভ্রমণকারীদের মন জুড়িয়ে দেয়। মাধবকুণ্ডের কোলাহল থেকে দূরে পরিকুণ্ডের এই নিস্তব্ধ পরিবেশ মানসিক প্রশান্তি আনে।
থাকা-খাওয়ার তথ্য
পরিকুণ্ড বা মাধবকুণ্ড এলাকায় বিলাসবহুল কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। তাই থাকার জন্য পর্যটকদের মৌলভীবাজার জেলা শহর বা শ্রীমঙ্গলে ফিরে আসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সেখানে বাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট পেয়ে যাবেন। এছাড়া খাবার দাবারের জন্য মাধবকুণ্ডের আশপাশে ছোটোখাটো কিছু লোকাল হোটেল রয়েছে, যেখানে গ্রামীণ পরিবেশে সাধারণ ও সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। একটু ভালো মানের খাবারের জন্য বড়লেখা বাজার বা মৌলভীবাজার শহরে যাওয়া ভালো।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
পরিকুণ্ড ঝর্ণা যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?
বর্ষাকাল হলো পরিকুণ্ড ঝর্ণা ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, কারণ এ সময়ে ঝর্ণাটি পূর্ণ যৌবন লাভ করে এবং পানির প্রবাহ অনেক বেশি থাকে।
পরিকুণ্ড ঝর্ণায় যাওয়ার পথে কি কোনো ঝুঁকি আছে?
ছড়ার ভেজা পাথরগুলোতে শ্যাওলা থাকার কারণে এগুলো বেশ পিচ্ছিল হয়। তাই সাবধানে পা ফেলে হাঁটতে হবে। এছাড়া সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করলেই ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।
মাধবকুণ্ড থেকে পরিকুণ্ডের দূরত্ব কতটুকু?
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের মূল এলাকা থেকে হেঁটে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট দূরত্বেই পরিকুণ্ড ঝর্ণার অবস্থান।


