হাম হাম ঝর্ণা: রাজকান্দি বনের এক গোপন বিস্ময়
বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম এবং রোমাঞ্চকর প্রাকৃতিক জলপ্রপাত হলো হাম হাম ঝর্ণা (Hum Hum Waterfall)। এটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গহীন গভীরে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এটি “চিতা ঝর্ণা” বা “হাম্মাম ঝর্ণা” নামেও পরিচিত। প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে আঁকাবাঁকা পাথুরে শরীর বেয়ে আছড়ে পড়া জলধারা এবং চারপাশের গাঢ় সবুজ বনানী পর্যটকদের এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই বুনো ঝর্ণাটি বর্তমানে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ট্রাভেলারদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
হাম হাম ঝর্ণা ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
ঝর্ণার আসল রূপ ও যৌবন দেখতে হলে বর্ষাকাল (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) হলো সেরা সময়। এ সময় ঝর্ণায় প্রচুর পানি থাকে এবং এর গর্জন দূর থেকে শোনা যায়। তবে বর্ষায় বনের রাস্তা অত্যন্ত কাদাটে, পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। যারা একটু শান্ত পরিবেশে এবং কম ঝুঁকিতে ট্রেকিং করতে চান, তারা বর্ষার ঠিক পরপরই অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে যেতে পারেন। শীতকালে ঝর্ণার পানি অনেকটাই কমে যায়।
কীভাবে যাবেন এবং যাতায়াত খরচ
হাম হাম ঝর্ণায় যেতে হলে আপনাকে প্রথমে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আসতে হবে।
১. ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে শ্রীমঙ্গল:
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে খুব সহজেই শ্রীমঙ্গল আসা যায়। কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা বা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে আসা সম্ভব (ভাড়া আসনভেদে ১৫০ থেকে ৮০০+ টাকা)। এছাড়া সায়েদাবাদ ও আরামবাগ থেকে শ্যামলী, হানিফ বা এনা পরিবহনের বাস চলে। চট্টগ্রাম থেকেও পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসে শ্রীমঙ্গল পৌঁছানো যায়।
২. শ্রীমঙ্গল থেকে কলাবন পাড়া:
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএনজি বা জিপ (চান্দের গাড়ি) রিজার্ভ করে আপনাকে যেতে হবে কমলগঞ্জের কলাবন পাড়ায়। যাওয়া-আসার জন্য সিএনজি ভাড়া সাধারণত ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা নিতে পারে।
৩. কলাবন পাড়া থেকে ঝর্ণা (ট্রেকিং):
কলাবন পাড়া থেকে শুরু হয় মূল ট্রেইল। গহীন বনের ভেতরে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পাহাড়ি পথ, কাদা ও ছড়া পেরিয়ে হেঁটে ঝর্ণায় পৌঁছাতে হয়। পথ সুনির্দিষ্ট না থাকায় কলাবন পাড়া থেকে স্থানীয় গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। গাইড ফি বাবদ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়।
কোথায় থাকবেন ও খাবেন
হাম হাম ঝর্ণার আশেপাশে থাকার মতো কোনো হোটেল নেই। তাই আপনাকে রাত যাপনের জন্য শ্রীমঙ্গল শহরে ফিরে আসতে হবে। শ্রীমঙ্গলে বাজেটের মধ্যে থাকার জন্য অনেক রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ রয়েছে। যেমন— টি রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সুলতান, রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট অথবা শ্রীমঙ্গল শহরের ভেতরের বিভিন্ন মানের হোটেল।
খাবার: ট্রেকিং শুরুর আগে কুড়মা বাজার বা কলাবন পাড়ায় হাল্কা নাস্তা করে নেওয়া ভালো। কলাবন পাড়ায় স্থানীয় আদিবাসী বা চা-শ্রমিকদের বাড়ি আগে থেকে বলে রাখলে তারা দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয় (দেশি মুরগি, ডাল ও ভাত)। ট্রেকিংয়ের সময় সাথে প্রচুর পানি, স্যালাইন ও শুকনো খাবার রাখুন।
জরুরি টিপস ও সতর্কতা
- গ্রিপিং জুতো: ট্রেইলে প্রচুর কাদা ও পিচ্ছিল পাথর থাকে, তাই ভালো গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতো বা এ্যাংকলেট রাবার জুতো ব্যবহার করুন।
- বাঁশের লাঠি: কলাবন পাড়া থেকেই ৫-১০ টাকা দিয়ে একটি বাঁশের লাঠি কিনে নিন, যা পাহাড় ওঠানামায় দারুণ সাহায্য করবে।
- জোঁকের ভয়: বনের মধ্যে প্রচুর জোঁক থাকে। জোঁক ছাড়ানোর জন্য সাথে লবণ, গুল বা সরিষার তেল রাখুন।
- জরুরি প্রসাধন: ফুল হাতা গেঞ্জি ও ট্রাউজার পরা ভালো, এতে মশা ও গাছপালার আঁচড় থেকে বাঁচা যায়।
- পরিবেশ রক্ষা: বনের মধ্যে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা অপচনশীল বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষিত করবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. হাম হাম ঝর্ণার ট্রেকিং কি খুব কঠিন?
হ্যাঁ, এটি মাঝারি থেকে কঠিন মাত্রার ট্রেকিং। পাহাড়ি কাদা পথ, উঁচু-নিচু টিলা এবং পিচ্ছিল ছড়া দিয়ে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা যাতায়াত করতে হয়, তাই শারীরিক ফিটনেস থাকা প্রয়োজন।
২. পরিবার বা শিশুদের নিয়ে কি হাম হাম যাওয়া নিরাপদ?
ছোট শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা শারীরিক সমস্যা থাকা মানুষদের এই ট্রেইলে না যাওয়াই শ্রেয়।
৩. গাইড নেওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?
হ্যাঁ, গহীন বনাঞ্চলের ভেতর পথ হারিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তাই স্থানীয় গাইড সাথে নেওয়া আবশ্যক।


