পরিচিতি
চা পাতার সবুজ গালিচার জন্য শ্রীমঙ্গল দেশজুড়ে পরিচিত হলেও এর বুকে লুকিয়ে আছে আরেকটি চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য—সোনালী আনারসের বাগান। চারদিকে পাহাড়ি টিলা আর তার গায়ে সারি সারি আনারস গাছের সমারোহ প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পকর্ম। মিষ্টি ঘ্রাণ আর রসালে ভরপুর শ্রীমঙ্গলের আনারস ভ্রমণপিপাসুদের মনে সহজেই জায়গা করে নেয়। যারা একটু ভিন্নধর্মী ও প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য শ্রীমঙ্গলের আনারস বাগান হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য।
আনারসের ইতিহাস ও উৎপত্তির গল্প
আনারসের আদি নিবাস ব্রাজিল কিংবা প্যারাগুয়ে হলেও বাংলাদেশে এর বিস্তার বেশ চমকপ্রদ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চলে প্রথম আনারস চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে তা সিলেটের বিয়ানিবাজারের জলঢুপ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে ‘জলঢুপি আনারস’ নামে খ্যাতি লাভ করে। একসময় সিলেটের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশে বা পাহাড়ি ঢালুতে এই সুস্বাদু ফলের চাষ হতো।
যেসব এলাকায় দেখা মিলবে আনারস বাগানের
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে একটু দূরে এগোলেই চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ আনারস বাগান। প্রধানত যে এলাকাগুলোতে বাগানগুলোর দেখা মেলে:
- মোহাজেরাবাদ
- বিষামণি ও হোসেনাবাদ
- বালিশিরা ও ডলুছড়া
- সাতগাঁও পাহাড়
- নন্দরানী ও মাইজদী পাহাড়ি এলাকা
এখানে মূলত হানি কুইন, জায়ান্ট কিউ এবং এমবি-২ জাতের আনারস বেশি চাষ হয়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের যাওয়ার পথেই দুইপাশে দেখা মিলবে এই বাগানগুলোর, যা দেখলে মনে হবে সবুজ পাহাড়ের বুকে সোনালী রত্ন লুকিয়ে আছে।
ভ্রমণের সেরা সময়
সারা বছরই কম-বেশি আনারস পাওয়া গেলেও গ্রীষ্মকালই হলো আনারস বাগান ভ্রমণের মোক্ষম সময়। এই সময়ে গাছগুলো পাকা ফলে ভরে থাকে এবং বাগানের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
যাওয়ার উপায় ও খরচ
ঢাকা থেকে সড়ক বা রেলপথে খুব সহজেই শ্রীমঙ্গল পৌঁছাতে পারেন।
বাসে যাতায়াত:
ঢাকার ফকিরাপুল বা সায়দাবাদ থেকে হানিফ, শ্যামলী বা সিলেট এক্সপ্রেসের মতো বাসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। বাসভাড়া সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
ট্রেনে যাতায়াত:
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী বা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে সরাসরি শ্রীমঙ্গল নামা যায়। ট্রেনের টিকিটের মূল্য শোভন ২০০ টাকা, শোভন চেয়ার ২৪০ টাকা, স্নিগ্ধা ৪৬০ টাকা এবং এসি সিট ৫৫২ টাকা থেকে শুরু হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকেও পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া সম্ভব। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল ভাড়া করে সহজেই পাহাড়ি অঞ্চলের বাগানগুলোতে ঘুরে বেড়ানো যায়।
থাকা ও খাওয়ার তথ্য
শ্রীমঙ্গলে থাকার জন্য মানসম্মত অনেক রিসোর্ট, কটেজ ও হোটেল রয়েছে। বাজেট অনুযায়ী ১,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত রাতের থাকার রুম পেয়ে যাবেন। খাওয়ার জন্য শ্রীমঙ্গল শহরের বিভিন্ন লোকাল হোটেলে ঐতিহ্যবাহী সাত রঙের চা এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। এছাড়া তাজা আনারস তো বাগানের পাশ থেকেই কেটে খেতে পারবেন!
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. আনারস বাগান ভ্রমণের জন্য সেরা মাস কোনটি?
মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল আনারস বাগান ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়।
২. শ্রীমঙ্গল শহর থেকে আনারস বাগানগুলোর দূরত্ব কত?
শহর থেকে সিএনজি বা মোটরসাইকেলে করে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রধান বাগানগুলোতে পৌঁছে যাওয়া যায়।
৩. বাগান থেকে কি সরাসরি আনারস কেনা যায়?
হ্যাঁ, বাগান থেকে তাজা ও একদম গাছের পাকা সুস্বাদু আনারস খুব কম দামে কিনতে পারবেন।


