ভূমিকা
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজার যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক ক্যানভাস। এর সবুজ পাহাড়, চা বাগান আর বুনো পথ ভ্রমণপিপাসুদের সবসময়ই টানে। এই জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর চা বাগানের ভেতরে লুকিয়ে আছে তেমনই এক জাদুকরি সৌন্দর্য—ক্যামেলিয়া লেক। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বিসলার বান’ নামেই বেশি পরিচিত। চা পাতার সুবাস আর নীল জলের এই মায়াবী রূপ যে কাউকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে ফেলতে বাধ্য।
ক্যামেলিয়া লেকের পরিচিতি ও ইতিহাস
ব্রিটিশ মালিকানাধীন ডানকান ব্রাদার্সের বিশাল শমশেরনগর চা বাগানের প্রায় ৪৩২৬.৪৭ একর জায়গার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এই লেকটি। মূলত চা গাছে সেচ দেওয়ার জন্যই কৃত্রিমভাবে এমন বহু লেক তৈরি করা হয়েছিল, যার মধ্যে ক্যামেলিয়া লেকের সৌন্দর্য সবচেয়ে আলাদা। ব্রিটিশ কোম্পানির মূল প্রতিষ্ঠান ‘ক্যামেলিয়া পিএলসি’-র নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। এর পাশেই ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। লেকের চারপাশের উঁচু-নিচু টিলা, সারি সারি চা গাছ, আর টলটলে পানিতে আকাশ ও মেঘের প্রতিচ্ছবি এক অপূর্ব পিনপতন নীরবতার সৃষ্টি করে।
কেন যাবেন ক্যামেলিয়া লেকে? (দর্শনীয় দিক)
- সবুজের মায়াজাল: চারদিকে শুধু চা পাতার সবুজ গালিচা আর চা শ্রমিকদের কাজ করার দৃশ্য।
- অতিথি পাখি ও জীববৈচিত্র্য: শীতকালে লেকের পানিতে হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলি মুখরিত থাকে। মাঝে মাঝে লেকের পাড়ে বুনো বানরের দলের দেখাও মিলতে পারে।
- পাকা পাটাতন: লেকের ওপর একটি সুন্দর পাকা পাটাতন রয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্যানোরামিক ভিউ উপভোগ করা যায়।
- শমশেরনগর গলফ মাঠ: লেক থেকে ফেরার পথে দেখা মিলবে নৈসর্গিক এক গলফ মাঠের, যা আপনার ক্লান্তি দূর করতে দারুণ এক জায়গা।
কীভাবে যাবেন ও যাতায়াত খরচ
ঢাকা থেকে ক্যামেলিয়া লেকে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর আসতে হবে।
যাওয়ার রুট:
- বাসে: ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গলের বাস ধরে শমশেরনগর নামতে পারেন। ভাড়া সাধারণত ৬০০-১০০০ টাকা।
- ট্রেনে: ঢাকা থেকে সুরমা বা পারাবত এক্সপ্রেসে চড়ে সরাসরি শমশেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে নামতে পারবেন।
- স্থানীয় যাতায়াত: শমশেরনগর বাজার বা চাতলাপুর চেকপোস্ট সড়ক ধরে দক্ষিণে তিন কিলোমিটার গেলে ‘ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল’ পড়বে। হাসপাতালটিকে পেছনে রেখে আরও প্রায় দুই কিলোমিটার মাটির রাস্তা পার হলেই দেখা মিলবে কাঙ্ক্ষিত লেকের। এই পথটুকু যাওয়ার জন্য সিএনজি বা লোকাল অটোরিক্সা ভাড়া করতে হবে (৩০০-৫০০ টাকা)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: চা বাগান কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে লেকে প্রবেশের জন্য আগে থেকেই অনুমতি নিতে হয়। বড় দলের জন্য অনুমতি পাওয়া একটু কঠিন হলেও ছোট দল বা পরিবার নিয়ে এলে কিছু নিয়ম মেনে সহজে অনুমতি পাওয়া যায়। তাই যাওয়ার আগে স্থানীয় গাইড বা বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
থাকা ও খাওয়ার সুবিধা
ক্যামেলিয়া লেকের আশেপাশে থাকার কোনো ভালো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। তাই থাকা ও খাওয়ার জন্য আপনাকে শ্রীমঙ্গল শহর বা শমশেরনগর বাজারে ফিরে আসতে হবে। শ্রীমঙ্গলে সব বাজেট অনুযায়ী আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ পেয়ে যাবেন। এছাড়া স্থানীয় কোনো ভালো মানের রেস্টুরেন্টে ঐতিহ্যবাহী সাত রঙের চা ও স্থানীয় খাবার চেখে দেখতে ভুলবেন না।
সচেতনতা ও ভ্রমণের টিপস
- চা বাগানের পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষা করুন, যত্রতত্র প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলবেন না।
- স্থানীয় চা শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষের নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলুন।
- ফটোগ্রাফির জন্য সকালের বা বিকেলের আলো সবচেয়ে চমৎকার।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ক্যামেলিয়া লেক কোথায় অবস্থিত?
এটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর চা বাগানের ভেতরে অবস্থিত।
২. ক্যামেলিয়া লেক স্থানীয়দের কাছে কী নামে পরিচিত?
স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বিসলার বান’ নামেও বেশ পরিচিত।
৩. লেকে প্রবেশের জন্য কি কোনো অনুমতি লাগে?
হ্যাঁ, এটি চা বাগানের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে প্রবেশের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়।
৪. ক্যামেলিয়া লেক ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?
শীতকাল লেক ভ্রমণের জন্য সেরা সময়, কারণ এ সময় প্রকৃতি থাকে স্নিগ্ধ এবং প্রচুর অতিথি পাখির দেখা মেলে।


